রসুন: কতটুকু কীভাবে খাব
সুদীপ নাথ
রসুন—রান্নাঘরের অতি পরিচিত একটি উপাদান। তার ঝাঁঝালো গন্ধ, তীব্র স্বাদ এবং রান্নায় অনন্য ভূমিকার সঙ্গে আমরা সকলেই পরিচিত। কিন্তু এই ছোট্ট কোয়ার ভেতরে লুকিয়ে আছে এমন কিছু রাসায়নিক যৌগ, যেগুলি নিয়ে বহুদিন ধরেই বিজ্ঞানীদের আগ্রহ। লোকজ চিকিৎসায় রসুনের ব্যবহার বহু প্রাচীন; আধুনিক বিজ্ঞানও এখন তার কিছু সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা করছে। তবে রসুনকে কোনও রোগের ‘অলৌকিক ওষুধ’ হিসেবে দেখার পরিবর্তে তার উপকারিতা ও সীমাবদ্ধতা—দুই-ই জানা জরুরি।
রসুনের অন্যতম আলোচিত যৌগ হলো অ্যালিসিন (Allicin)। মজার বিষয়, আস্ত রসুনের কোষ অক্ষত অবস্থায় অ্যালিসিন কার্যত তৈরি অবস্থায় থাকে না। রসুনের কোষের বিভিন্ন অংশে আলাদা অবস্থায় থাকে অ্যালিন (Alliin) এবং অ্যালিনেজ (Alliinase) নামের একটি এনজাইম। রসুন কাটা, থেঁতলানো বা চিবানোর ফলে কোষগুলি ভেঙে গেলে এই উপাদানগুলি পরস্পরের সংস্পর্শে আসে এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে অ্যালিসিনসহ বিভিন্ন organosulfur compound তৈরি হয়। রসুনের স্বতন্ত্র ঝাঁঝালো গন্ধের পেছনেও এই ধরনের সালফার-সমৃদ্ধ যৌগের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
এই কারণেই রসুন ব্যবহারের একটি ছোট্ট কৌশল উপকারী হতে পারে। রসুন থেঁতলে বা কুচিয়ে সঙ্গে সঙ্গে প্রচণ্ড তাপে রান্না করার পরিবর্তে কিছুক্ষণ রেখে দিলে অ্যালিনেজ এনজাইমের কাজ করার সুযোগ পাওয়া যায় এবং অ্যালিসিন তৈরি হতে পারে। বিভিন্ন গবেষণায় রান্নার আগে কিছু সময় অপেক্ষা করার সম্ভাব্য উপকারের কথা উঠে এসেছে। তবে ‘ঠিক ১০ মিনিট’ অপেক্ষা করলেই সর্বোচ্চ অ্যালিসিন তৈরি হবে—এমন কোনও সর্বজনস্বীকৃত বৈজ্ঞানিক নিয়ম নেই। সময়, তাপমাত্রা, রসুনের ধরন এবং প্রস্তুত করার পদ্ধতির ওপর ফলাফল নির্ভর করতে পারে।
আর একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি—অ্যালিসিন তাপ-সহনশীল কোনও অপরিবর্তনীয় পদার্থ নয়। অতিরিক্ত তাপে অ্যালিনেজের কার্যক্ষমতা নষ্ট হতে পারে এবং অ্যালিসিন ও অন্যান্য সালফার-সমৃদ্ধ যৌগের পরিমাণও রান্নার পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। তাই রসুনের সম্ভাব্য উপকারী যৌগগুলি যতটা সম্ভব সংরক্ষণ করতে চাইলে কুচি বা থেঁতলানো রসুন রান্নার একেবারে শুরুতেই দীর্ঘ সময় উচ্চ তাপে ভাজা না করে রান্নার অপেক্ষাকৃত পরের দিকে যোগ করা একটি যুক্তিসঙ্গত পদ্ধতি হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে কাঁচা রসুনই সবসময় বেশি উপকারী বা রান্না করা রসুনের কোনও মূল্য নেই।
রসুনের স্বাস্থ্যগত প্রভাব নিয়ে মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণায় কিছু আশাব্যঞ্জক ফল পাওয়া গেছে। বিশেষ করে নির্দিষ্ট garlic preparation বা supplement নিয়ে গবেষণায় রক্তচাপের সামান্য হ্রাস এবং রক্তের মোট কোলেস্টেরল ও LDL কোলেস্টেরলের মাত্রায় কিছুটা উন্নতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কিছু গবেষণায় রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণেও সামান্য উপকারের সম্ভাবনা দেখা গেছে। তবে এই প্রভাব ব্যক্তি, রসুনের preparation এবং ব্যবহৃত মাত্রার ওপর নির্ভর করতে পারে। তাই রসুনকে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস বা কোলেস্টেরলের ওষুধের বিকল্প ভাবার কোনও কারণ নেই।
রসুনের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা নিয়ে প্রচলিত ধারণাও যথেষ্ট জনপ্রিয়। কিছু গবেষণায় রসুনের নির্দিষ্ট preparation-এর সঙ্গে সর্দি-জাতীয় upper respiratory infection-এর ক্ষেত্রে সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। কিন্তু ‘রসুন রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়’—এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তে পৌঁছনোর মতো প্রমাণ এখনও নেই। একইভাবে পরীক্ষাগারে রসুনের কিছু যৌগের জীবাণু ও ভাইরাসের বিরুদ্ধে কার্যকলাপ দেখা গেলেও, তার ভিত্তিতে রসুনকে মানুষের সংক্রমণের চিকিৎসায় ‘প্রাকৃতিক অ্যান্টিবায়োটিক’ বা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধের বিকল্প বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঙ্গত নয়।
রসুনের প্রদাহ-নিয়ন্ত্রণকারী বা antioxidant প্রভাব নিয়েও গবেষণা চলছে। কিন্তু বাতের ব্যথা সারিয়ে দেওয়া, শরীরের ‘টক্সিন’ বের করে দেওয়া কিংবা ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধ করার মতো দাবির পক্ষে মানুষের ওপর যথেষ্ট শক্ত প্রমাণ নেই। একইভাবে রসুন খেলে পাকস্থলী বা কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি ‘অনেকটাই কমে যায়’—এমন নিশ্চিত বক্তব্যও দেওয়া যায় না। কিছু observational ও laboratory research আশাব্যঞ্জক হলেও ক্যানসার প্রতিরোধের জন্য রসুনকে প্রমাণিত উপায় হিসেবে বিবেচনা করার মতো clinical evidence এখনও যথেষ্ট নয়।
তাহলে রসুন কীভাবে খাওয়া উচিত? এর কোনও একক ‘সেরা’ পদ্ধতি নেই। রান্নায় স্বাভাবিক পরিমাণে রসুন ব্যবহার করা সাধারণত খাদ্যাভ্যাসের একটি ভালো অংশ হতে পারে। কাঁচা রসুন খাওয়া বাধ্যতামূলক নয়, আর খালি পেটে খেলে বিশেষ কোনও অতিরিক্ত স্বাস্থ্য-উপকার হয়—এমন নির্ভরযোগ্য প্রমাণও নেই। বরং কাঁচা রসুন অনেকের ক্ষেত্রে বুকজ্বালা, অম্বল, পেটের অস্বস্তি, গ্যাস বা ডায়রিয়ার মতো সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই শরীরের সহনশীলতা অনুযায়ী রসুন খাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।
রসুনের গুঁড়ো বা garlic supplement-এর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। বিভিন্ন গবেষণায় বিভিন্ন ধরনের preparation ও বিভিন্ন মাত্রা ব্যবহৃত হয়েছে। ফলে সবার জন্য প্রতিদিন ৪০০ থেকে ১২০০ মিলিগ্রাম garlic powder গ্রহণের মতো একটি নির্দিষ্ট universal dose নির্ধারণ করা ঠিক নয়। খাদ্য হিসেবে রসুন এবং concentrated supplement—দুটিকে এক জিনিস হিসেবে দেখাও উচিত নয়।
ঞআর একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতার বিষয় হলো রক্তক্ষরণের সম্ভাবনা। রসুনের কিছু উপাদান platelet function ও রক্ত জমাট বাঁধার প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে concentrated garlic supplement ব্যবহারকারীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। যারা warfarin-এর মতো anticoagulant কিংবা aspirin-এর মতো antiplatelet ওষুধ গ্রহণ করেন, তারা নিয়মিত বা বেশি মাত্রায় রসুনের supplement নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নিলে নিরাপদ। কোনও বড় অস্ত্রোপচারের আগে garlic supplement বন্ধ রাখার প্রয়োজন আছে কি না, সেটিও চিকিৎসক বা সার্জনের সঙ্গে আলোচনা করাই সঠিক পদ্ধতি। ‘সবাইকে অপারেশনের ঠিক দুই সপ্তাহ আগে রসুন সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে’—এমন সার্বজনীন নিয়ম নেই।
শেষ পর্যন্ত রসুনকে দেখার সবচেয়ে সুন্দর ও বৈজ্ঞানিক উপায় সম্ভবত মাঝামাঝি পথেই। এটি শুধু রান্নার স্বাদ ও গন্ধ বাড়ানো একটি মসলা নয়; এর মধ্যে থাকা organosulfur compounds নিয়ে আধুনিক বিজ্ঞান যথেষ্ট আগ্রহী। রসুনের কিছু সম্ভাব্য cardiovascular ও metabolic উপকারের পক্ষে গবেষণালব্ধ প্রমাণও রয়েছে। কিন্তু সম্ভাবনা আর নিশ্চিত চিকিৎসা এক জিনিস নয়।
প্রকৃতি আমাদের খাদ্যের মধ্যেই অনেক উপকারী উপাদান দিয়েছে। সেই উপকারকে সম্মান করার অর্থ অতিরঞ্জিত অলৌকিক দাবি করা নয়; বরং যতটুকু বিজ্ঞান জানে, ঠিক ততটুকুই বলা। রসুন সেই অর্থে কোনও ‘অমৃত’ নয়—কিন্তু সুষম খাদ্যাভ্যাসের একটি মূল্যবান ও সুস্বাদু উপাদান অবশ্যই।