৫ই সেপ্টেম্বর আমাদের ক্যালেন্ডারে একটি দিন মাত্র নয়, একটি ধারণার উদযাপন। জাতীয় শিক্ষক দিবসকে আমরা সাধারণত ফুল, কার্ড ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখি। কিন্তু এর পেছনে যে গভীর দার্শনিক ও সমাজতাত্ত্বিক তত্ত্ব আছে, তা নিয়ে আলোচনা কম হয়।
শিক্ষক দিবস কোনো ব্যক্তির জন্মদিন পালন নয়, এটি ভূমিকার স্বীকৃতি। সমাজে ডাক্তার জীবন বাঁচান, কৃষক খাদ্য যোগান, কিন্তু শিক্ষক সেই মানুষগুলোকে তৈরি করেন যাঁরা ডাক্তার বা কৃষক হবেন। অর্থাৎ শিক্ষক হলেন দ্বিতীয় স্তরের স্রষ্টা। শিক্ষক দিবস এই অদৃশ্য নির্মাণকাজকে দৃশ্যমান করার দিন। এই দিবসটি মনে করিয়ে দেয়, শিক্ষা কোনো পণ্য নয়, এটি একটি সম্পর্ক।
আমরা মুখে বলি শিক্ষক জাতির মেরুদণ্ড। কিন্তু বাস্তব চিত্র ভিন্ন। একটি সমীক্ষা বলছে, ভারতে আজও ৫৪% অভিভাবক চান না তাঁর সন্তান শিক্ষক হোক। কারণ, সম্মান আছে কিন্তু আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নেই।
এখানেই তৈরি হয় দ্বন্দ্ব। আমরা শিক্ষককে ত্যাগের প্রতীক হিসেবে দেখতে ভালোবাসি, কিন্তু ত্যাগকে পেশা করা যায় না। একজন শিক্ষক যদি সারাক্ষণ বেতন, বদলি, ট্রেনিং-এর চিন্তায় থাকেন, তবে তিনি মুক্ত চিন্তা করবেন কীভাবে? তাই শিক্ষক দিবসের বিশ্লেষণে এই প্রশ্ন তোলা জরুরি- আমরা কি শিক্ষককে দেবতা বানিয়ে তাঁর মানবিক চাহিদাগুলোকে ভুলে যাচ্ছি?
ভারতীয় দর্শনে তিন ধরনের শিক্ষকের কথা বলা হয়েছে। আচার্য-যিনি শুধু তথ্য দেন। গুরু- যিনি তথ্যের সাথে অন্ধকার দূর করেন, গুমানে অন্ধকার, রুমানে আলো। সদগুরু- যিনি শিষ্যকে নিজের মতো করে ভাবতে শেখান, অনুকরণ করতে নয়।
আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই আচার্য তৈরি করছে, গুরু নয়। আমরা সিলেবাস শেষ করছি, কিন্তু জিজ্ঞাসা তৈরি করতে পারছি না। NEP-2020 এই জায়গাতেই পরিবর্তন আনতে চাইছে- মুখস্থ থেকে মুক্ত চিন্তায় ফেরা। প্রকৃত শিক্ষক দিবস হবে সেদিন, যেদিন ছাত্র শিক্ষককে প্রশ্ন করতে ভয় পাবে না।
পাওলো ফ্রেইরির মতে, দুই ধরনের শিক্ষা আছে- ব্যাংকিং মডেল এবং সমস্যা-কেন্দ্রিক মডেল। ব্যাংকিং মডেলে শিক্ষক ছাত্রের মাথায় তথ্য জমা করেন, যেমন ব্যাংকে টাকা জমা হয়। আর সমস্যা-কেন্দ্রিক মডেলে শিক্ষক ও ছাত্র একসাথে সমাজের সমস্যা নিয়ে আলোচনা করেন।
ভারতের প্রেক্ষাপটে দ্বিতীয় মডেলটি বেশি প্রাসঙ্গিক। আমাদের শ্রেণিকক্ষে জাত, ধর্ম, লিঙ্গ, দারিদ্র্য- সবকিছুই ঢুকে পড়ে। একজন শিক্ষক যদি শুধু অঙ্ক না শিখিয়ে, অঙ্কের মাধ্যমে জীবনের বৈষম্য বোঝাতে পারেন, তবেই তিনি শিক্ষক। তাই শিক্ষক দিবসের মূল তত্ত্ব হলো- শিক্ষক হলেন সেই ব্যক্তি যিনি ছাত্রকে নিজের অধীনে রাখেন না, বরং তাকে স্ব-অধীন অর্থাৎ স্বাধীন হতে শেখান।