*শব্দের আকাশে চিরজাগরূক নক্ষত্র—প্রীতম ভট্টাচার্যকে শ্রদ্ধাঞ্জলি*
*১০ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮১ — ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬*
*রাজু ভৌমিক*
কিছু মানুষের চলে যাওয়া শুধু একটি পরিবারের ক্ষতি নয়—তা হয়ে ওঠে একটি সময়ের, একটি সমাজের এবং একটি সাহিত্যভুবনের অপূরণীয় শূন্যতা। প্রীতম ভট্টাচার্য ছিলেন তেমনই এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাঁর আকস্মিক প্রয়াণে আজ ত্রিপুরার সাহিত্যাকাশ বিষণ্ন, স্তব্ধ ও অশ্রুসিক্ত।
উদয়পুরের জগন্নাথ দিঘির এই কৃতী সন্তান ছিলেন একাধারে গুণী শিক্ষক, কবি, প্রাবন্ধিক, গল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং স্বপ্নসৃষ্টিকারী প্রকাশক। স্বল্পায়ু জীবনে তিনি সৃষ্টি করে গেছেন এক বিস্ময়কর সাহিত্যভাণ্ডার। তাঁর উপন্যাস ‘তুমি মানে আমি’, কাব্যগ্রন্থ *নিরুদ্দেশ হতে চাই*, *ভ্যালেন্টাইনে আবার জয়িতাকেই চাই*’, *প্রেমে পড়া মানা* এবং গল্পগ্রন্থ *শেষ বিকেলে যদি তুমি বলো*বাংলা সাহিত্যের পাঠকমনে স্বতন্ত্র স্থান করে নিয়েছে।
প্রীতম ভট্টাচার্যের প্রকাশনা-জগতের অবদানও ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান *শঙ্খচিল*-এর পাশাপাশি *জ্ঞান-বীক্ষণ*-ও ছিল তাঁর সৃজনশীল ও মননশীল উদ্যোগের উল্লেখযোগ্য অংশ। এই প্রকাশনাগুলোর মাধ্যমে তিনি বহু নবীন, অচেনা ও প্রতিভাবান সাহিত্যিকের লেখা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। অসংখ্য লেখকের স্বপ্নকে তিনি দিয়েছেন প্রকাশের সুযোগ, আত্মবিশ্বাস এবং সাহিত্যজগতে পরিচিত হয়ে ওঠার পথ।
তিনি শুধু একজন প্রকাশক ছিলেন না; তিনি ছিলেন সাহিত্যপ্রেমী মানুষের আশ্রয়, আস্থার ঠিকানা এবং অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর হাত ধরে ত্রিপুরা ও ত্রিপুরার বাইরের বহু গুণীজন সাহিত্যজগতে পরিচিতি ও সম্মান অর্জন করেছেন।
ব্যক্তিগতভাবে প্রীতম ভট্টাচার্য ছিলেন আমার কবি বন্ধু এবং ছোট ভাইয়ের মতো। তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল স্নেহ, ভালোবাসা, বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধায় পূর্ণ। তাঁর অকালে চলে যাওয়া আমার ব্যক্তিগত জীবনে যেমন গভীর শূন্যতা তৈরি করেছে, তেমনি সাহিত্যজগতেও রেখে গেছে এক অপূরণীয় ক্ষত।
২৬ সেপ্টেম্বরের সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা যেন কেড়ে নিল এক অসমাপ্ত মহাকাব্যকে। কিন্তু মানুষ চলে গেলেও তাঁর সৃষ্টি থেকে যায়। শব্দ কখনও মরে না। লেখক চলে যান, কিন্তু তাঁর লেখা, তাঁর স্বপ্ন এবং তাঁর কর্ম সময়ের বুক চিরে অনন্তকাল বেঁচে থাকে।
আজ প্রীতম নেই, কিন্তু তাঁর বইয়ের পাতায় তিনি আছেন; তাঁর শব্দে তিনি আছেন; তাঁর প্রকাশিত অসংখ্য লেখকের সাফল্যে তিনি আছেন; তাঁর স্বপ্নপূরণ করা মানুষের হৃদয়ে তিনি আছেন।
প্রীতম ভট্টাচার্যের অকাল প্রয়াণে সাহিত্যজগৎ হারাল এক নিবেদিতপ্রাণ স্রষ্টা, প্রকাশক ও সহৃদয় মানুষকে। আর আমি হারালাম এক প্রিয় কবি বন্ধুকে, এক স্নেহের ছোট ভাইকে।
প্রীতম ভট্টাচার্যের স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা, অশ্রুসিক্ত প্রণাম ও অন্তহীন ভালোবাসা।
তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর শব্দে, তাঁর সৃষ্টিতে, তাঁর প্রকাশনায় এবং আমাদের স্মৃতিতে—চিরকাল।
প্রতিবেদন ও শ্রদ্ধাঞ্জলি
রাজু ভৌমিক
ভাইস প্রিন্সিপাল
সুকান্ত একাডেমি ইংলিশ মিডিয়াম হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল,