শিশুরকৈশোরে উত্তরণ ও আমাদের কর্তব্য
সুদীপনাথ
শিশুরদুর্বলতার প্রতি কঠোর, যুক্তিনিষ্ঠ, খুঁতখুঁতে, সংযমী এবং অসহিষ্ণু হওয়াযতই কঠিন হোক নাকেন, তা শিশুর জন্যেইসবচেয়ে আগে প্রয়োজনীয়। বাহ্যিকসংযম এবং নীতিনিষ্ঠতার আড়ালেআন্তরিকতা বজায় রেখে চলা,পূর্ণ যুক্তিনিষ্ঠতা এবং কঠোরতার আড়ালেস্নেহপূর্ণ এবং সাগ্রহ মনোযোগপ্রদান, শিশুর মানবীয় দুর্বলতাগুলোর প্রতি শ্রদ্ধা পোষণ এবং সেইসবদুর্বলতাগুলো থেকে তাদের মুক্তিলাভেরকার্যকরি সহায়তা প্রদান- ঠিক এইভাবেই মা-বাবাদের নিজেদের শিক্ষামূলক ক্রিয়াকলাপের ভিত্তি গড়া উচিত। তারকোনও বিকল্প আছে কিনা, তাভেবে দেখার সময় এসেছে।
অনেককেইএই বিষয়ে শিশুদের প্রতি অবিচার নিয়েও প্রশ্ন তুলতে দেখা যায়। তারাবলে থাকেন যে, এসব অবিচারনাকি আসলে কঠোরতারই নামান্তর,এইসব নাকি শিশুর মনকেশক্ত করে তুলে। আমিকিন্তু এখানে একটা প্রশ্ন তুলবইযে, এসমস্ত ভূমিকা সত্যিই শিশুর মনকে শক্ত করেতুলে কিনা। কারণ, শিশুরা সবসময়ই দুর্বল, বড়দের দাপট এবং ঔদ্ধত্যেরসামনে তারা সবসমই অসহায়।বড়রা নিজেদের অজ্ঞাতসারেই নিষ্ঠুর হয়ে উঠেন বরাবর।দায়িত্বহীনতা প্রয়শই নিষ্ঠুরতার জন্ম দেয়। শিশুদেরপ্রতি অবিচার খুবই মারাত্মক বিষয়।এসব তাদের কোমল মনকে গভীরভাবেআহত করে এবং তাদেরনৈতিক অনুভুতিকে ক্রমশ বিকৃত করে তুলে। তারফলাফল চোখে আঙুল দিয়েদেখিয়ে দিতে হয় না।তবে অধিকাংশ ছেলে-মেয়ে বেশভালোভাবেই এসব বাধা-বিপত্তিঅতিক্রম করে এগিয়ে যায়।ঠিকমত পড়াশুনা করে, বাড়ীতে ওস্কুলে ভালো আচরণ করে,পরিশ্রমী হয়। অথচ এমনটিইদেখা যায়, প্রাইমারি স্কুলেরসময়ে, যারা বেশ বাধ্য,তারাই কৈশোরে আমাদের জ্বালিয়ে মারে। তখন পরিবর্তনগুলো চোখেপড়ার মত।
কিশোরবয়েসের এইসব আচার আচরণেরজন্য, আমাদের আগাম প্রস্তুতি নাথাকলে, পরিস্থিতি জটিল থেকে জটিলতরহয়। এবার দেখা যাক,আসলে এই সংকটগুলোর সময়েঠিক কি কি ঘটে।তখন সবচেয়ে আগে তার সাবালকত্বআসে। এখন সে আরমাত্র বয়েসের দিক থেকেই বড়হয়নি, সে এখন বড়হয়েছে আত্মিক এবং শারীরিক দিকথেকেও। এই সময়ে, অনেকছোটবেলার কিছুদিন ধরে চলা একগুঁয়েমি,স্বেচ্ছাচারিতা, আত্মনির্ভরতা, আত্মকেন্দ্রিকতা আর আত্মনির্ভরতার অবিরামপ্রয়াসের নূতন করে আবির্ভাবঘটে। তবে এসব শুরুহয় খুবই জটিল ভাবে।এখন তার আত্ম-বিশ্লেষণখুব তাড়াতাড়িই ঘটে যায়। এখনমা-বাবা ও অন্যদেরদিকে সমালোচনামূলক মূল্যায়নের ঝোঁক বাড়ে। কারওপ্রতি সে তার মূল্যায়নঘন ঘন পরিবর্তিত করে।তার কোন বন্ধু তাকেসাহায্যের হাত বাড়ালে, সেহয়ে উঠে তার কাছেখুব ভাল। কয়েকদিন পর,ঝগড়া বাধলেই বলে দেবে তাকেআমি দু’চোখে দেখতে পারিনা, সে আমার আসলবন্ধু নয়। কোনো ছেলে-মেয়েই এই বয়েসে, পরস্পরবিরোধী কথাবার্তা (contradictorycomments) পছন্দ করেনা। তাই মা-বাবাদেরওকম খোঁটা খেতে হয়না। কখনোহয়ত, কোনো কথা দিয়েওকথা রাখলেন না, তখনও খোঁটাশুনায়। শিক্ষকদেরও সমালোচনা করতে ছাড়েনা। সিনেমারনায়ক-নায়িকাদের সমালোচনা করে। প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিদেরসমালোচনা করে বা তাদেরসম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে।
মনেরাখতে হবে, এসব কিন্তুমামুলি ব্যাপার নয়, বা যুক্তিহীনবিদ্বেষ থেকে আসা বাখেলাচ্ছলে সমালোচনা নয়। সে তখনজীবনকে নূতন ভাবে দেখতেশিখছে, সে অশান্ত ভাবেসমস্ত বিষয়ে তার মনের মতঅনুকরণ যোগ্য প্রকৃত বীরকে খুঁজে চলেছে, যা এতোদিন ধরেতাকে সব্বাই মিলে শেখানো হয়েছে।কারণ সে মানুষের মতমানুষ হতে চায়। সেএখন সেই উন্মাদনায় ভুগছে।কিশোর-কিশোরীদের অবাধ্যতাকে অসৎসঙ্গের ফলাফল হিসেবে দেখা অনুচিত। অথবাক্রমানুবতির লক্ষণ বা শিক্ষিত করেতুলতে না পারার ব্যর্থতাহিসেবেও মনে করা উচিতনয়। ভুলে গেলে চলবেনা,এই সময়েও অনেক বিষয়েই তারাবালকোচিত ধ্যানধারণা নিয়েও চালিত হয়, নাহলে একেআমরা উত্তরণ হিসেবে আখ্যায়িত করতাম না।
অনেকসময় কেউ কাওকে ধাক্কাদিয়ে ফেলে আনদ পায়,আর এর থেকে অনেকসময় ঘটে যায় দুর্ঘটনা।আবার, ছেলেরা কখনো কখনো মদখেয়ে ফেলে, আর পরিণামে শুরুহয় মারপিট। ঘরের কাজের জিনিসনষ্ট করে ফেলে। এমনঘটনাও আকছার ঘটে। এসব ঘটনায়আমরা যেসব যুক্তি খাড়াকরি, তা “এমন হবেআগে ভাবতেও পারিনি” বা “আমি তোএমন আশা করিনি” ধরণের। ছেলে-মেয়েরা এইবয়েসে এসবের পরিণাম সম্পর্কে বড়োদের সাবধান বাণীগুলোকে অতি বিমূর্ত কোনোব্যাপার বলেই মনে করে।তারা ভাবে যে, এসবব্যাক্তিগতভাবে তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। তারা একটাকথাই ভাবে, তা হল, “মাবাবা জানলে রক্ষে নেই”। আর কিছুইতারা ভাবেনা। তারা তাদের আত্মমর্যাদাবোধেরজন্যেই এসব কাজ করেফেলে। অন্য সব পরিণামতাদের কাছে তুচ্ছ বলেইতারা মনে করে।
কিশোর-কিশোরীকবে নিজে থেকে উদ্যোগী হয়ে, সাহসিকতা ও ধৃষ্টতা আর স্বাধীনতা ও স্বেচ্ছাচারিতার ফারাকবুঝতে পেরে যাবে, সেই আশায় চুপচাপ বসে থাকলে, মারাত্মক ভুল হবে। এমতাবস্থায় আমাদেরকী করণীয় ? একদিকে বলপ্রয়োগ করাও যেমন অনুচিত, ঠিক তেমনি চুপচাপ বসে বসে নিরীক্ষণ করেওচলা যায়না। প্রশ্নটি সত্যি সত্যিই খুব জটিল। আসুন এবার আসল স্থানে দৃষ্টিপাত করা যাক।আগে ছেলেমেয়েদের বলা হত- “এটা করা করা উচিত নয়”।কিন্তু এখন ঠিক এই কথাটিই বলা হয়, বেশির ভাগ মা-বাবাদের ক্ষেত্রে।
শিশু থেকে বালক,বালক থেকে তারা যখন কৈশোরে পা দেয়, তখন এইসব সঙ্কটজনক পর্বে অনেকেই বলে থাকেন, তাহলেকি তার অর্থ এই যে, তারা মাথায় চড়ে বসবে ? তা নিশ্চয়ই নয়। তবে শিক্ষার উদ্দেশ্য কিন্তুসবসময় দমিয়ে রাখা এবং বাধা-নিষেধের মাধ্যমে নাজেহাল করে তোলা নয়। শিক্ষাদীক্ষার আসলএবং সর্বোপরি উদ্দেশ্যই হচ্ছে, চরিত্র ও মেজাজের প্রাথমিক প্রবণতাকে সঠিক পথে পরিচালিতকরা। এই সংকটজনক পর্বই হচ্ছে আসল সময়। এটাই ঠিক সেই সন্ধিক্ষণ, যার পরেই শুরু হবে,এই শিক্ষা পেয়ে, ভবিষ্যৎ বিকাশের প্রকৃত পথটাকে চিনে নেয়া। আত্মপ্রতিষ্ঠার স্বজ্ঞাতথা নিজস্ব বুদ্ধি-বিবেচনা সম্পর্কে বলতে গিয়ে আমি কিন্তু, পুরোপুরিভাবে কিশোর-কিশোরীদেরপক্ষকে সমর্থন করতে চাইছি না। তাছাড়া এখানে সমস্ত কিছুই স্বজ্ঞায় নয়। বহু মা-বাবারপ্রধান শিক্ষাগত ত্রুটি হচ্ছে এই যে, তারা তাদের সন্তানদের উপর নিজেদের অভিজ্ঞতা লব্ধএবং মানবজাতির এযাবৎ অর্জিত জ্ঞানের ফলাফল চাপিয়ে দিতে অনবরত চেষ্ঠা করে করেন। কিন্তুএকেবারে ছোটবেলা থেকে প্রতিটি শিশুর ক্ষেত্রেই, নিজের অভিজ্ঞতার সমস্তকিছুই উপলব্ধিকরার অদম্য বাসনা থাকে। সেই জন্যেই প্রস্তুত (readymade) সত্যকে সে গ্রহন করে অনিচ্ছায়,নিস্ক্রিয় ভাবে। এই গ্রহন কার্যকরি effective) হবে কতটুকু, তার প্রশ্ন থেকেই যায়। এসবেরদ্বারা সে অনুপ্রাণিত হয় না। তাই দেখা যায়, আমাদের বহু বাধানিষেধ আর হিতোপদেশে কানদিলেও, তাদের নিজে নিজে জানার প্রলোভন থেকেই যায়।
তবে আসল কথাহচ্ছে, ব্যক্তিত্ব গড়ে উঠে সক্রিয় কাজকর্মের মধ্য দিয়েই। নিয়ম মুখস্থ করার মধ্য দিয়েতা গড়ে উঠে না। তা’ই হচ্ছে তাদের বিকাশের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া,এটা ভালো করে আমাদের বোঝা উচিত। সে জন্যেই বাস্তবিক ক্ষেত্রে, প্রায়শই তারা মা-বাবারবাধা-নিষেধ অমান্য করে। সাধারণত তা হয় গোপনে, ক্বচিৎ প্রকাশ্যে। গোপনে এসব অমান্য করলেও,পরে অবিশ্যি সবকিছুই খোলাখুলিভাবে স্বীকার করে নেবার সাহস দেখায়, এমন কি সবার সামনেপর্যন্ত। কিশোর বয়েসের বৈশিষ্ঠই হচ্ছে এই যে, তখন অনেক নিয়ম লঙ্ঘন করা হয় খোলাখুলিভাবে,এমন কি সবার সামনেও। তাদের উদারতা, স্বনির্ভরতা ও ন্যায়পরায়ণতার শিক্ষা পাওয়া উচিতসমস্ত শৈশব কাল ধরেই। কিন্তু কেবল পিতা-মাতা আর শিক্ষকদের উপদেশ স্মরণ রাখার মধ্য দিয়েতা শেখা যায়না, আত্মস্থ করা যায়না। সর্বাগ্রে পরিবারের দৈনন্দিন জীবনই শিশুর মধ্যেএই গুণগুলো গড়ে তুলে। উদারতা ও ন্যায়পরায়ণতার অনুভূতি যদি বিকশিত না হয়, তাহলে আত্মনির্ভরতাঅর্জনের প্রয়াস সহজেই দ্বায়িত্বহীন বিদ্রোহ আর অর্থহীন হামলার আকার ধারণ করতে পারে,এমন চিত্র প্রায়শই চোখে পরে। এসব কারণেই অনেক ছেলেমেয়ে ঘর ছেড়ে পালায়।
কৈশোরে উদারতাও ন্যায়পরায়ণতা শেখানো কি সম্ভব ? তখন কি দেরি হয়ে যায় না ? হামেশাই মা-বাবারা এমনপ্রশ্ন নিয়ে হাজির হন। না, তখন একেবারেই দেরিহয়ে যায় না। কারণ, মানুষ উদারতার চাহিদা অনুভব করে সারা জীবন ধরেই। আর ন্যায়পরায়ণতাহচ্ছে কিশোর-কিশোরীদের কাছে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য শক্তি এবং যুক্তি। এবং যেহেতু তারা এইশক্তিকে শ্রদ্ধা করে এবং পরস্পর-বিরোধীতা (self contradiction) ভালোব