রূপালী নৌকার যাত্রী

শিকদার বাসির


কুয়াশাটা সাধারণ ছিল না। ওটা ছিল স্মৃতির মতো ধূসর, আর একটুখানি কর্পূরের মতো গন্ধযুক্ত।

​ভাস্কর যখন চোখ মেলল, সে নিজেকে আবিষ্কার করল এক অন্তহীন জলরাশির ধারে। আকাশটা নীল নয়, বরং এক অদ্ভুত তাম্রবর্ণের, যেখানে কোনো সূর্য নেই কিন্তু আলো ছড়িয়ে আছে চারদিকে। তার পায়ের নিচে বালির বদলে ছিল কুচকুচে কালো স্ফটিকের গুঁড়ো।

​তার মনে পড়ছিল না সে কে, কোথা থেকে এসেছে। শুধু মনে ছিল একটা তীব্র আকুলতা, তাকে ওপারে যেতে হবে। কিন্তু কিসের ওপারে?

​ঠিক তখনই কুয়াশা ফুঁড়ে একটা নৌকা এসে ভিড়ল ঘাটে। নৌকাটা কাঠ বা লোহার তৈরি নয়; ওটা যেন জমাট বাঁধা জোছনা দিয়ে গড়া। নৌকার গলুইতে বসে আছেন এক বৃদ্ধ। তাঁর চুল-দাড়ি রুপোর সুতোর মতো চকচক করছে, আর চোখ দুটো যেন দুটি জ্বলন্ত নক্ষত্র।

​\\\"তুমি কি পার হতে চাও, পথিক?\\\" বৃদ্ধের কণ্ঠস্বর কোনো মানুষের মতো শোনাল না, যেন বহু দূর থেকে ভেসে আসা অদ্ভুত ধরণের ঘণ্টার ধ্বনি।

​\\\"আমি ওপারে যেতে চাই,\\\" ভাস্কর বলল, \\\"কিন্তু আমার কাছে কোনো মুদ্রা নেই। মাঝিকে দেওয়ার মতো কিছুই আনিনি।\\\"

​বৃদ্ধ মৃদু হাসলেন।

​\\\"এই নদীতে পারাপারের জন্য কোনো পার্থিব মুদ্রার প্রয়োজন হয় না। এখানে মাশুল দিতে হয় নিজের অহংকার, পরিচয় এবং অতীত দিয়ে। তুমি কি তৈরি?\\\"

ভাস্কর এক মুহূর্ত দ্বিধা করল। সে নিজের নামটুকু ছাড়া আর কিছুই মনে করতে পারছিল না, তবু এক অদ্ভুত টানে সে নৌকায় উঠে বসল। নৌকাটি কোনো দাঁড় ছাড়াই অবলীলায় ভাসতে শুরু করল সেই রূপালী জলের বুকে।

নৌকা যখন মাঝনদীতে, তখন জলের রঙ বদলে গেল। জল এত স্বচ্ছ হয়ে উঠল যে নিচের অতল তলদেশ দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু সেখানে কোনো মাছ বা জলজ উদ্ভিদ ছিল না; সেখানে ভাসছিল ভাস্করের ফেলে আসা জীবনের খণ্ড খণ্ড দৃশ্য।

​হঠাৎ নদীর বুকে একটা বিশাল দ্বীপ জেগে উঠল। দ্বীপটি পুরোপুরি আয়না দিয়ে তৈরি। নৌকার গতি মন্থর হলো। বৃদ্ধ মাঝি বললেন, \\\"এটি ভ্রমের দ্বীপ। 

। ওদিকে তাকাও, পথিক।\\\"

​ভাস্কর আয়নার দিকে তাকাতেই তিনটি অবয়ব দেখতে পেল:

১. এক প্রবল পরাক্রমশালী রাজা, যার মাথায় সোনার মুকুট। (ভাস্করের মনে হলো, এটা তার ভেতরের ক্ষমতার লোভ)।

২.  এক ক্রন্দনরত নিঃসঙ্গ বালক, যে অন্ধকারে হাতড়াচ্ছে। (তার ভেতরের ভয় ও অতীত ক্ষত)।

৩. এক রূপবতী নারী, যে তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে। (পার্থিব মোহ)।

​আয়নার ভেতরের দৃশ্যগুলো ভাস্করকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করতে লাগল। তার মনে হলো সে নৌকা থেকে লাফিয়ে ওই দ্বীপে চলে যায়। তার হৃদপিণ্ড দ্রুত চলতে লাগল, কপালে জমল ঘাম।

​\\\"ওরা তোমাকে বন্দি করতে চায়,\\\" মাঝির শান্ত কণ্ঠস্বর তাকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। \\\"ওরা তোমারই অহংকারের রূপভেদ। যদি ওদের সত্য বলে মেনে নাও, তবে এই নদী কোনোদিন শেষ হবে না।\\\"

​ভাস্কর চোখ বন্ধ করল। সে গভীর একটা শ্বাস নিয়ে বলল, \\\"আমি রাজা নই, আমি ওই নিঃসঙ্গ বালকও নই, আর এই মোহও আমার নয়। আমি কেবলই এক যাত্রী, যে আলোর সন্ধানে চলছে।\\\"

​যখন সে চোখ মেলল, দেখল আয়নার দ্বীপটি কর্পূরের মতো বাতাসে মিলিয়ে গেছে। নদী আবার শান্ত।

​নৌকা এবার এক ঘন অন্ধকারের মধ্যে প্রবেশ করল। এমন অন্ধকার, যেখানে নিজের হাতও দেখা যায় না। কিন্তু ভাস্করের মনে কোনো ভয় ছিল না, বরং এক পরম শান্তি তাকে গ্রাস করল।

​হঠাৎ দূরের শূন্য থেকে একটা বাঁশির সুর ভেসে এল। সেই সুরের কোনো ভাষা ছিল না, কিন্তু ভাস্কর তার প্রতিটি তান বুঝতে পারছিল। সুরটি বলছিল, \\\"যা কিছু দৃশ্যমান, তা-ই ক্ষণস্থায়ী আর যা অদৃশ্য, তা-ই চিরন্তন।\\\"

​ধীরে ধীরে অন্ধকারের পর্দা চিরে এক অদ্ভুত জ্যোতির্ময় আলোর উদয় হলো। ভাস্কর দেখল, নদীর ওপারে কোনো ঘাট নেই, কোনো মাটি নেই। সেখানে কেবল এক অনন্ত আলোর সমুদ্র, যা থেকে কোটি কোটি নক্ষত্র তৈরি হচ্ছে আবার সেই আলোতেই মিলিয়ে যাচ্ছে।

​\\\"আমরা এসে গেছি,\\\" বৃদ্ধ মাঝি বললেন।

​ভাস্কর নৌকার বাইরে পা বাড়াতে গিয়ে দেখল, তার নিজের শরীরটাও আর রক্ত-মাংসের নেই। ওটাও আলো দিয়ে তৈরি হয়ে গেছে। সে বৃদ্ধের দিকে তাকাল এবং স্তম্ভিত হয়ে গেল।

​সে দেখল, নৌকায় কোনো বৃদ্ধ মাঝি নেই। সেখানে বসে আছে সে নিজেই! বৃদ্ধ মাঝি আর কেউ নন, তারই অন্তরাত্মার এক চিরন্তন রূপ, যা তাকে এতকাল ধরে পথ দেখিয়ে এনেছে।