হারিয়ে যাওয়া সম্মান
শিকদার বাসির
লাল সিগন্যাল জ্বলে উঠতেই ব্যস্ত শহরের ছুটে চলা মানুষগুলো এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। গাড়ির হর্ন, রিকশার টুংটাং আর হকারদের হাঁকডাকে চারদিক মুখর। কিন্তু ফুটপাতের কোণে, একটি বন্ধ দোকানের শাটারের পাশে বসে থাকা বৃদ্ধটির দিকে কারও চোখ গেল না। শুধু রিনা থেমে দাঁড়াল।
সামনে অ্যালুমিনিয়ামের ছোট্ট একটি বাটি। গায়ে মলিন জামা, চোখে ক্লান্তির ছাপ। বাটিটি প্রায় খালি।
বাড়ি ফিরে রিনা মাকে বলল,
“মা, দাদুটাকে দেখে খুব কষ্ট লাগল।”
মা মৃদু হেসে বললেন,
“পারলে কিছু দিও। তবে মনে রেখো, মানুষের সবচেয়ে বড় অভাব সব সময় টাকার নয়; অনেক সময় সম্মানেরও হয়।”
পরদিন রিনা টিফিনের টাকা বাঁচিয়ে কয়েকটি বিস্কুট কিনে নিয়ে গেল।
“দাদু, আজ কেমন আছেন?”
বৃদ্ধ বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে হাসলেন।
“ভালো আছি, দাদু। অনেক দিন পর কেউ মানুষ ভেবে আমার খবর নিল।”
এরপর থেকে রিনা প্রায় প্রতিদিনই কয়েক মিনিট সময় নিয়ে তাঁর পাশে বসত। কখনো বিস্কুট, কখনো ফল, কখনো শুধু গল্প। একদিন বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,
“দাদু, মানুষ যখন নাম ধরে ডাকে না, তখন একসময় নিজের নামটাও ভুলে যেতে বসে।”
কথাটা রিনার বুকের ভেতর কাঁটার মতো বিঁধে রইল।
একদিন কয়েকজন সহপাঠী বলল,
“তুই ওই ভিক্ষুকের সঙ্গে এত কথা বলিস কেন?”
রিনা শান্ত গলায় উত্তর দিল,
“তিনি ভিক্ষুক হতে পারেন, কিন্তু তার আগে তিনি একজন মানুষ। সম্মান পাওয়ার অধিকার তাঁরও আছে।”
কথাগুলো শুনে সবাই চুপ করে গেল।
কিছুদিন পর স্কুলে ‘মানবিকতা’ বিষয়ে রচনা লিখতে দিলেন শিক্ষিকা। রিনা লিখল সেই বৃদ্ধের গল্প, যার সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ছিল একজন মানুষের মতো আচরণ।
রচনাটি পড়ে শিক্ষিকার চোখ ভিজে উঠল। তিনি পুরো ক্লাসে পড়ে শোনালেন।
সেদিনের পর থেকে অনেক শিক্ষার্থীই স্কুল শেষে বৃদ্ধের কাছে থামতে শুরু করল। কেউ খাবার দিল, কেউ সালাম জানাল, কেউ শুধু হাসিমুখে বলল, “দাদু, কেমন আছেন?”
বৃদ্ধের বাটিতে আগের চেয়ে কিছু বেশি টাকা জমল। কিন্তু তার চেয়েও বড় কথা, তাঁর চোখে ফিরে এল হারিয়ে যাওয়া আত্মমর্যাদার আলো।
সেদিন রিনা কোনো ভিক্ষুককে সাহায্য করেনি; সে একজন মানুষের হারিয়ে যাওয়া সম্মানের পাশে দাঁড়িয়েছিল। কারণ মানুষের সবচেয়ে বড় অভাব সব সময় রুটির নয়, কখনো কখনো একটি সম্মানজনক সম্বোধনের ।
Discussion